সংবাদদাতাঃ শীতের তীব্রতায় যখন জনপদের মানুষ ঘরের ভেতর লেপ-কম্বলে গা ঢেকে নিশ্চিন্তে ঘুমায়, ঠিক তখনই পাবনার বেড়া উপজেলার বাঁধ এলাকায় আশ্রিত শত শত মানুষ রাত কাটান চরম কষ্ট আর অনিশ্চয়তার মধ্যে। খোলা আকাশের নিচে, নদীর হিমেল বাতাসে কাঁপতে কাঁপতে তাদের রাত পোহাতে হয় সূর্যের অপেক্ষায়।
বেড়ার বাঁধে বসবাসকারীদের কাঁথা, পুরোনো কাপড়ই তাদের একমাত্র সম্বল। নেই পর্যাপ্ত লেপ-কম্বল, নেই শীত নিবারণের কোনো ব্যবস্থা। শীতের রাতে শিশু, বৃদ্ধ ও নারীরা সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়ছে।
নদীভাঙনে সর্বস্ব হারিয়ে বাঁধে আশ্রয় নেওয়া পাইখন্দ মহল্লার সালেহা খাতুন (৬৮) কাঁপতে কাঁপতে বলেন, ‘বাবা, গায়ে দেওয়ার লেপ-কম্বল কিছুই নেই। একটা কাঁথা দিয়া কি আর এই শীত যায়? সারা রাত ঘুম আসে না। শুধু ভোরের সূর্যের দিকে তাকাইয়া থাকি।’
গত এক সপ্তাহ ধরে তাপমাত্রা ক্রমেই কমছে। ভোরের দিকে ঘন কুয়াশা, হিমেল বাতাস আর ঠান্ডা শিশিরে বেড়া উপজেলার চর ও বাঁধ এলাকার জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে নদীঘেঁষা এলাকায় বাতাসের প্রকোপ বেশি হওয়ায় শীতের তীব্রতা আরো কয়েক গুণ বেড়ে গেছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, সন্ধ্যার পর থেকেই ঠান্ডা বাড়তে শুরু করে। গভীর রাতে তা অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছায়। ঘরে বা বাইরে কোথাও স্বস্তি নেই। অনেক পরিবার বাঁধের ওপরে ছেঁড়া ত্রিপল আর খড় দিয়ে কোনো রকমে মাথা গোঁজার ঠাঁই বানিয়ে বসবাস করছে। এদের বেশির ভাগই যমুনা নদীর ভাঙনে ঘরবাড়ি হারানো মানুষ। একসময় চরে বা নদী-তীরবর্তী এলাকায় বসবাস করলেও নদী গিলে নিয়েছে তাদের ভিটেমাটি। উপায় না পেয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে তারা আশ্রয় নিয়েছেন বাঁধে।
বাঁধে বসবাসরত অনেকেরই কোনো স্থায়ী ঘর নেই। অনেকেই পলিথিন আর বাঁশ দিয়ে বানানো ঘরে কোনোভাবে রাত কাটাচ্ছেন। শীত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কষ্টও বাড়ছে বহুগুণ। সবচেয়ে কষ্টে রয়েছেন শিশু ও বৃদ্ধরা। বাঁধে দেখা যায়, অনেক শিশু মায়ের কোলে কাঁপছে। শীতের কারণে অসুস্থ হয়ে পড়ছে তারা।
পায়না মহল্লার সাজেদা খাতুন বলেন, ‘বাচ্চাগুলা সারা রাত কান্দে। ঠান্ডায় জ্বর-কাশি ধরছে। চিকিৎসারও ব্যবস্থা নেই। অনেকেই হাঁটতে পারেন না, শীতের কারণে শরীর ব্যথায় জর্জরিত। পর্যাপ্ত খাবার ও উষ্ণ কাপড়ের অভাবে তাদের জীবন আরো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।’
আশ্রিতরা অনেকেই বলেন, ‘এখনো পর্যন্ত পর্যাপ্ত সরকারি বা বেসরকারি সহায়তা পাননি তারা। কেউ কেউ মাঝেমধ্যে স্থানীয়দের কাছ থেকে সামান্য খাবার বা পুরোনো কাপড় পেলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অতি সামান্য। শীত আইছে অনেক আগেই, কিন্তু এখনো লেপ-কম্বল পাই নাই। যদি কম্বল পাইতাম, তাইলেই অনেক উপকার হতো।’
শীত যতই বাড়ছে, বাঁধে আশ্রিতদের দুর্ভোগও ততটাই বাড়ছে। তারা দ্রুত লেপ-কম্বল, শীতবস্ত্র ও জরুরি সহায়তা চান। পাশাপাশি অসুস্থদের জন্য চিকিৎসা সহায়তা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন মহল। আশ্রিত সালেহা খাতুনের কণ্ঠে একটাই আকুতি—‘আমরা বড় কিছু চাই না। এই শীতে বাঁচার মতো একটু লেপ-কম্বল চাই।’
বেড়ার মানবিক সংস্থা হিসেবে পরিচিত ‘শিক্ষার্থী সহযোগিতা সংগঠন’-এর প্রতিষ্ঠাতা মেহেরাব হোসেন জিম বলেন, ‘আমরা বাঁধে আশ্রিতসহ বেড়ার শীতার্ত মানুষের জন্য ৫০০ কম্বল বিতরণের উদ্যোগ নিয়েছি। চার-পাঁচ দিনের মধ্যেই কম্বল বিতরণ শুরু করব বলে আশা রাখি। তবে বাঁধে আশ্রিত শত শত মানুষের মধ্যে কম্বল বিতরণ করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। এজন্য সরকারি পর্যায়ে সহযোগিতা প্রয়োজন বলে মনে করি।’
বেড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুনাল্ট চাকমা বলেন, ‘বেড়া উপজেলার নদীতীরবর্তী ও বাঁধ এলাকায় অবস্থান করা অসহায় শীতার্ত মানুষের কষ্টের বিষয়টি শুনেছি। বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ ও নারীদের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী এসব অসহায় শীতার্ত মানুষের মধ্যে শীতবস্ত্র বিতরণ করা হবে।’






