ভাঙ্গুড়ায় সরষে ফুলে গেছে দিগন্ত জুরে ফসলের মাঠ

ভাঙ্গুড়ায় সরষে ফুলে গেছে দিগন্ত জুরে ফসলের মাঠ

সংবাদদাতাঃ পাবনা ভাঙ্গুড়া উপজেলা জুড়ে সরিষার হলুদ ফুলে ছেয়ে গেছে দিগন্ত জোড়া ফসলের মাঠ। ফসলের মাঠের হলুদ রাজ্যে গুঞ্জনে মুখরিত মৌমাছির দল। মাঠ জুড়ে সরিষা ফুলের অপরূপ দোলাচলে কৃষকের চোখে মুখে ফুটে উঠেছে আনন্দের হাসি। শীতের সকালের নরম রোদে উপজেলার মাঠগুলো যেন নতুন করে জেগে উঠেছে। যতদূর চোখ যায়, শুধু হলুদ আর হলুদ। সরিষা ফুলে ঢাকা বিস্তীর্ণ মাঠ দেখে মনে হয়, প্রকৃতি নিজ হাতে হলুদের চাদর বিছিয়ে দিয়েছে। বাতাসে দুলতে থাকা ফুলের ফাঁকে ফাঁকে মৌমাছির গুঞ্জন আর মাঠের আইলে দাঁড়িয়ে থাকা কৃষকদের চোখ-মুখে এক রাশ আশা। এ যেন শুধু ফসলের মাঠ নয়, বরং কৃষকের স্বপ্নের রাজ্য।

এক সময় লাভ না হওয়া ও অব্যাহত লোকসান গুনতে থাকায় পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলা তথা চলনবিল অঞ্চলে সরিষা চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছিলেন চাষিরা। এখন স্বপ্ন দেখছেন বাম্পার ফলনের। গত বছর স্থানীয় বাজারে উন্নত জাতের সরিষার দাম ভাল পাওয়ায় কৃষকরা এবারও সরিষা চাষে অধিক আগ্রহী হয়ে পড়েছে। বিনামূল্যে পাওয়া উচ্চফলনশীল জাতের সরিষা ফলনে কৃষকের প্রশান্তির হাসি দীর্ঘ হচ্ছে।

ফলে এ বছর উপজেলায় সরিষার চাষ বেড়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবছর সরিষার বাম্পার ফলনের আশা করছেন কৃষকরা। গত বছর স্থানীয় বাজারে সরিষার ভালো দাম পাওয়ায় এবার এ উপজেলার এক হাজারের বেশি কৃষক এ সরিষা চাষ করেছেন। আগামীতে এ জাতের সরিষা চাষে কৃষকরা আরও আগ্রহী হবেন বলে তাদের ধারণা। তবে শুধু ধান চাষ করলে হবে না। পাশাপাশি ভুট্টা, সরিষা, আলু, সূর্যমুখী ফুল, পাট, তিল,গবাদি প্রাণীর ঘাসসহ অন্যান্য ফসল চাষের প্রতিও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

কৃষকের নিপুণ হাতে প্রকৃতির বুকে গড়ে তোলা ভোজ্য তেল হিসেবে সরিষার তেলের চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। চলতি মৌসুমে এ উপজেলায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি জমিতে সরিষা আবাদ করা হয়েছে। কৃষি বিভাগের সহযোগিতা ও আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ভালো ফলনের পাশাপাশি দাম ভালো পাওয়ার আশা কৃষকদের। ভোজ্যতেলের আমদানি নির্ভরতা কমাতে কৃষি বিভাগের সহযোগিতায় আগামীতে আরও সরিষার আবাদ বৃদ্ধির চিন্তা-ভাবনা করছেন উপজেলা কৃষি অফিস।

উপজেলার বিভিন্ন সরিষাক্ষেত ঘুরে দেখা যায়, মাঠে যেন কেউ সবুজের গায়ে হলুদের আল্পনা দিয়ে রাঙিয়ে দিয়েছে। হলুদ ফুলে ভরে গেছে পুরো মাঠ। মাঠের পর মাঠ যেন হলুদের গালিচা। দিগন্ত জুড়ে শুধু হলুদের সমারোহ। সরিষার ফুলে ফুলে মৌমাছিরা মধু আহরণে ব্যস্ত। সরিষা ফুলের হলুদ রাজ্যে মৌমাছির গুনগুনানিতে মুখরিত হয়ে উঠেছে গোটা মাঠ।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উপজেলা কৃষি বিভাগের পরামর্শে পৌর এলাকা, ভাঙ্গুড়া, খানমরিচ, দিলপাশার, অষ্টমনিষা, পারভাঙ্গুড়া ও মন্ডতোষ ইউনিয়নে শতাধিক কৃষক ১৫ থেকে ৩০বিঘা করে জমিতে অধিক ফলনশীল জাতের সরিষা চাষ করেছেন।

উপসহকারী কৃষিকর্মকর্তা রনজিৎ কুমার বর্মন জানান, এ বছর উপজেলায় বারি-১৪ ও বিনা-১০ জাতের সরিষা চাষিরা হচ্ছেন, উপজেলার খানমরিচ ইউপি’র পুকুর পাড় গ্রামের কৃষক আব্দুস সালাম ফকির,সুলতানপুর গ্রামের কৃষক সুলতান মাহমুদ।এ সকল কৃষকগণ জানান,প্রতি বিঘা সরিষা চাষে খরচ হয়েছে প্রায় পাঁচ হাজার টাকা।এ ফসলের বাজারে চাহিদা ভালো থাকে এবং দামও ভালো পাওয়া যায়। বর্তমান সরিষার গাছ, ফুল-ফল ভালো হয়েছে। আশা করছি, বাম্পার ফলন হবে। গত বছরের মতো এবারও লাভবান হতে পারবো।

উপজেলার দিলপাশার ইউপি’র আদাবাড়িয়া গ্রামের মৃতঃ ময়েজ উদ্দিন খানের ছেলে প্রশিক্ষিত কৃষক সহকারী অধ্যাপক মো.গোলাম হাচনাইন খান, কৃষক সোনা উল্লাহ খান ও পার্শ্ববর্তী চকলক্ষ্মীকোল গ্রামের রফিকুল ইসলাম বলেন,সরিষার চাহিদা ভালো থাকাতে এবং চাষে ক্ষতির সম্ভাবনা কম থাকাতে প্রতি মৌসুমে সরিষার চাষ করি। আশা করছি এবারও দাম ভালো পাওয়া যাবে। এ বছর উপযুক্ত দাম পেলে আগামী বছর সরিষা চাষে আরও অনেকেই ঝুঁকে পড়বে বলে মনে করেন তিনি।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ শারমীন জাহান বলেন, কৃষকদের যথাযথ পরামর্শ ও পরিচর্যার বিষয়ে দিক-নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। চলতি মৌসুমে উপজেলায় বারি-৮, বারি-১৪, বারি-১৭, বারি-১৮, বিনা-৪, বিনা-৯, বীজ সরবরাহ ও বিতরণ করা হয়েছে। বারি-১৪ সহ অন্যান্য জাতের সরিষা বপনের মাত্র ৭৫-৮০ দিনের মধ্যে ফলন পাওয়া যায়। এ সরিষা উত্তোলন করে বোরো আবাদ করতে পারেন বলে কৃষকরা একে ‘লাভের ফসল’ হিসেবে অভিহিত করছেন। স্থানীয় বাজারে গত বছর ভালো দাম পাওয়ায় কৃষকরা সরিষা চাষে অধিক আগ্রহী হয়েছেন বলে মনে করছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবছর সরিষার ভালো আবাদ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তিনি আরো জানান, বারি-১৪ সরিষার গাছ লম্বা হওয়ায় এর পাতা মাটিতে ঝরে পড়ে জৈব সারের কাজ করায় জমির উর্বরতা শক্তি বাড়ে। অপর দিকে চলতি মৌসুমে বাণিজ্যিক পদ্ধতিতে মধু ব্যবসায়ীরা সরিষা ক্ষেতে মৌবক্স স্থাপন করে মধু উৎপাদন করে দেশের মধুর চাহিদা মেটাচ্ছে। এ জাতের সরিষা আবাদের পর ওই জমিতে বোরো আবাদে সারের পরিমাণ কম লাগে। তাই এ জাতের সরিষা চাষের জন্য আমরা কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে উদ্বুদ্ধ করা এবং বিভিন্ন উপকরণ সহায়তা প্রদান করা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *