॥ নুরুল ইসলাম বাবুল ॥
ছাত্র জীবনে আমাদের কমবেশি সবাইকে বাংলা বিষয়ে ‘সময়ের মূল্য’ শিরোনামের প্রবন্ধ রচনা পড়তে হয়েছে। তেমনি ইংরেজিতেও পড়েছি value of time প্যারাগ্রাফ বা অনুচ্ছেদ। এই রচনা বা প্যারাগ্রাফ বা অনুচ্ছেদ পড়তে গিয়ে একটি বাক্য বা sentence মন্ত্রমুগ্ধের মতো পড়েছি, তা হলো- ‘সময় ও নদীর স্রোত কারো জন্য অপেক্ষা করে না’ ইংরেজিতে পড়েছি- Time and taide wait for none যা আজও মনে গেঁথে আছে। সময়ের মূল্য বোঝাতে বা বুঝতে এই পাঠ ছিল অত্যাবশ্যক। তবে বাস্তব জীবনে সময়ের সঠিক ব্যবহার ব্যতীত এই পাঠের কোনো মূল্য নেই।
আমরা জানি, জাগতিক অমোঘ নিয়ম মেনেই পার হয় দিন, মাস, বছর। সেই নিয়মেই নববর্ষের নতুন বার্তা নিয়ে আমাদের মাঝে বারবার ঘুরে আসে এক- একটি নতুন বছর। নতুনভাবে পথ চলার অনুপ্রেরণা হয়ে শুরু হয় বছরের প্রথম ভাগ। এভাবেই যাওয়া-আসার মধ্য দিয়েই চলছে পৃথিবী, দেশ, সমাজ, পরিবার, মানুষের জীবন। কেননা সময় কখনো বসে থাকে না। সে তার মতো বয়ে চলে। আর যেতে যেতে কিছু ঘটনা, কিছু অঘটনের স্বাক্ষী হয়ে যায়। ব্যক্তি জীবনের নানা প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তীর হিসেবে নিকেশও জমা হয় সময় চলে যাওয়ার সাথে সাথেই। আমরা জানা আছে, যে সময় চলে যায় তা আর ফিরে আসে না। আবার সময় কারো জন্য অপেক্ষাও করে না। সে কেবলই সামনে ছুটে চলে। বিশ্বজগতও সময়ের সাথে সাথে সর্বদা গতিশীল। আমাদেরও চলতে হয় সময়ের সাথে পাল্লা দিয়েই। জীবনকে এগিয়ে নিতে হলে এছাড়া আর কোনো পথ নাই। পৃথিবীর জ্ঞানী ব্যক্তিরা কখনো সময়কে অবহেলা করেন নাই, করেন না। বিখ্যাত জার্মান দার্শনিক আর্থার শোপনহাউয়ার বলেছেন, “সাধারণ মানুষ সময়ের চলে যাওয়াকে তেমন গুরুত্ব দেয় না। বুদ্ধিমান মানুষ এর সাথে ছুটতে চায়।” অর্থাৎ সময়ের কাজ সময়ে করাই কর্তব্য। নইলে এর সঠিক ব্যবহার কখনোই সম্ভব নয়। আর সময়ের সঠিক ব্যবহার আমাদের জীবনকে সফলতার দিকে নিয়ে যায়, এতে কোনো সন্দেহ নাই। এ সম্পর্কে মার্কিন রাজনীতিবিদ, দার্শনিক এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় রাষ্ট্রপতি টমাস জেফারসন বলেছেন, “সময়কে যদি ঠিকমত ব্যবহার করা যায়, তবে কেউই সময় নিয়ে অভিযোগ করবে না। তুমি যদি সময়কে ঠিকমত ব্যবহার করো, তবে কাজের পরিমান দেখে তুমি নিজেই অবাক হয়ে যাবে।” প্রকৃত পক্ষে আমরা বাস্তব জীবনে সময়ের যথাযথ ব্যবহার না-করেই সময় নাই, সময় নাই বলে আহাজারি করি। আর আমাদের মতো মানুষদের উদ্দেশ্য করেই ফরাসি নীতিবাদী দার্শনিক, জিন দে লা ব্রুয়ের যিনি তাঁর ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের জন্য বিখ্যাত ছিলেন, তিনি বলেছেন, “যারা সময়কে ঠিকমত ব্যবহার করতে পারে না, তারাই আসলে সময় নিয়ে অভিযোগ করে।” আমাদের এই ক্ষণস্থায়ী জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি মূহুর্ত মূল্যবান। এই মূল্যবান সময়কে অবহেলা করার অর্থ নিজেকে অবহেলা করা। নিজের জীবনকে তুচ্ছ করে দেওয়া। জীবনে যত রকমের বাঁধা-বিপত্তি থাক না কেন, নিজেকে অবহেলা করার মতো বোকামি করা উচিত নয়। এমন নির্বুদ্ধিতা কখনোই কাম্য নয়। আমাদের উচিত জীবনের মূল্য অনুধাবন করা। তাহলে নিজেই বুঝতে পারা যাবে সময়ের মূল্য। ইংরেজ জীববিজ্ঞানী চার্লস ডারউইন এ সম্পর্কে বলেছেন, “যে লোক জীবনের একটি ঘন্টা নষ্ট করার সাহস করে, সে আসলে জীবনের মূল্য এখনও বোঝেনি।”
কথায় বলে ‘যত্ন করলে রত্ন মেলে’। একথা উপেক্ষা করার উপায় নেই। কেননা, যেকোনো বিষয়ে যে কেউ যত গুরুত্ব দিবেন, সেই বিষয়ে তিনি ততটাই অগ্রসর হবেন। সময়ের ক্ষেত্রেও তেমনটাই ঘটে। বিখ্যাত দার্শনিক মারিয়া এজগ্রোথ বলেছেন, “আমরা যদি সময়ের যত্ন নিই, তবে সময় আমাদের জীবনের যত্ন নেবে।” অর্থাৎ সময়কে আমরা যেভাবে মূল্য দেব, সময়ও অনুরূপভাবে আমাদের পাওনা ফিরিয়ে দিবে। তাই জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে কাজে লাগিয়ে নিজের অগ্রগতি ত্বরান্বিত করতে হবে। আমরা যদি আমাদের অস্তিত্বকে ভুলে না-যাই, তবে অবশ্যই সময়জ্ঞানও মন থেকে মুছে যাবে না। তখন
সময় আমাদের বেঁধে রাখতে পারবে না। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে, বলা যায় পাল্লা দিয়ে আমরাও ছুটতে পারব। সময় ধারণ করে দ্রুত বদলে যাচ্ছে পৃথিবী তথা মহাবিশ্ব। বদলে যাওয়ার, বদলে দেওয়ার প্রতিযোগিতায় দৌড়াচ্ছে সবাই। এই দৌড়ের পাল্লায় আমরা যদি স্থির হয়ে বসে থাকি তবে প্রতি সেকেন্ডে পিছিয়ে পড়তে থাকব। এভাবে পেছাতে পেছাতে দিন শেষে, মাস শেষে কিংবা বছর শেষে কতটা পিছিয়ে যাব তা ভাবতে পেরেছেন? আর একটা কথা বলি, আমাদের জীবনের চলে যাওয়া সময় নিয়ে আফসোস করে লাভ নেই। বরং আজ থেকেই সময়ের গুরুত্ব দিয়ে সময়কে কাজে লাগাই, তবে সেটাই আমাদের জন্য আলোকবর্তিকা হয়ে দেখা দিবে। এ সম্পর্কে দার্শনিক অ্যাশলে ওরমোন বলেছেন, “যে সময় হারিয়ে গেছে তাকে ফিরিয়ে আনা অসম্ভব। কিন্তু তুমি চাইলে যে সময় সামনে আসছে, তাকে সুন্দর করতে পারো।” আমরা অনেক সময় অযথা বসে বসে সময় নষ্ট করি। কখনো কখনো শুধু অলীক কল্পনায় দিনগুলো কাটিয়ে দিই। স্বপ্ন দেখি অনেক বড়ো হবো। বড়ো কিছু করব কিন্তু সেই কল্পনা বা স্বপ্নের পথে হাঁটি না বা সেই লক্ষ্যে কাজ করি না। ফলে আমাদের ভবিষ্যৎ কেবলই পেছনের দিকে ধাবিত হয়। আমরা যদি লক্ষ্য স্থির করে পথে নামতে পারি তবে সময়ের ব্যবধানে গন্তব্যেও পৌঁছাতে পারব। ভাগ্য এমনি এমনি তৈরি হয় না বরং নিরন্তর চেষ্টায় ভাগ্যের দ্বার উন্মোচন হতে থাকে। তাই কোকো শ্যানেল বলেছেন, “দেয়ালের দিকে তাকিয়ে সময় নষ্ট করো না। সেখানে একা একা দরজা জন্মাবে না। ওপাশে যেতে চাইলে দরজা বানাতে শুরু করো।” সত্যি বলতে কী, এটাই জীবনের ধর্ম হওয়া উচিত। অযথা হেলাফেলা করে বা অলসতা করে সময় পার করার মতো মহা অন্যায় আর নাই। গ্রামের সাধারণ মুরুব্বিদের মুখ থেকে প্রায়ই শুনতে পাই, “বুঝলিনারে ফেলি, বুঝবি দিন গেলি।” সময়ের কাজ সময়ে না-করা প্রতিবেশী বা স্বজনদের এভাবে মুরুব্বিগণ সতর্ক করে থাকেন। তাঁরা বোঝাতে চান সময়ের কাজ সময়ে করতে হবে, তা না হলে এক সময় এর চরম মূল্য দিতে হবে তখন ঠুকরে ঠুকরে কাঁদলেও কূল কিনারা পাওয়া যাবে না। এ সম্পর্কে বাউল সম্রাট লালন শাহের সেই বিখ্যাত গানের কথা মনে পড়ে যায়। সাঁইজি লিখেছেন-
সাঁইজি এই গানে সময়ের মূল্য বোঝাতে যে অভিব্যক্তি প্রকাশ করেছেন, তা অনুধাবন করতে পারলে, তা জীবনক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে পারলে জীবনের সাধনা পূর্ণ হবে। আমরা সেই সাধনাপূর্ণ জীবন কামনা করি। শুধু কামনা করলে হবে না, তার জন্য নিরন্তর চেষ্টা থাকতেও হবে। থাকতে হবে সময় জ্ঞানও। দিতে হবে সময়ের গুরুত্ব। এখানে সময়ের গুরুত্ব সম্পর্কে দুজন বিখ্যাত দার্শনিক ও গবেষকের উক্তি তুলে ধরতে চাই। তাঁদের মধ্যে প্রথমজন হচ্ছেন ফিলিপ স্ট্যানহোপ। তিনি বলেছেন, “সময়ের সত্যিকার মূল্য দাও। প্রতিটি মূহুর্তকে দখল করো, উপভোগ করো। আলস্য করো না। যে কাজ আজ করতে পারো, তা কালকের জন্য ফেলে রেখো না।”
সময়ের যথাযথ ব্যবহার করে জীবনে চরম সফলতা অর্জনকারী আমেরিকান নাগরিক লী লেকোকা। সময়ের ব্যবহার সম্পর্কে তাঁর মতামত স্মরণযোগ্য। তিনি বলেছেন, “যদি তোমার সময়ের সত্যিকার সদ্ব্যবহার করতে চাও, তবে কোন জিনিসটা তোমার কাছে সবচেয়ে জরুরী তা খুঁজে বের করো। তারপর পুরোটা সময় সেটার পেছনে ব্যয় করো।” সর্বোপরি আমাদের মনে রাখতে হবে, জীবন একটাই। হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখসহ নানারকম ঘটনা-অঘটন মিশে আছে এই জীবনের পরতে পরতে। নানা সময়ে নানা ধরণের যাতনা জীবনকে বিষিয়ে তোলে বটে। কিন্তু তারপরও বেঁচে থাকা আনন্দের। তারপরও এগিয়ে নিতে হয় জীবনের গতিপথ। এই এগিয়ে নেওয়ার জন্যই সময়কে মূল্য দিতে হবে। কেননা জীবনে সময় খুবই মূল্যবান।
লেখক : শিশুসাহিত্যিক, কবি ও কলামিস্ট






