দক্ষ মানব সম্পদ গড়ে তুলছে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আইকিউএসি

॥ ফারুক হোসেন চৌধুরী ॥

পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে অনন্য ভূমিকা পালন করে চলেছে ইনস্টিটিউশনাল কোয়ালিট অ্যাসুরেন্স সেল (আইকিউএসি)। বিশ্ববরেণ্য গবেষক অধ্যাপক এস এম আব্দুল-আওয়াল গত বছরের ২৫সেপ্টেম্বর উপাচার্য হিসেবে যোগদান করেই বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা ও শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধির পাশাপাশি দক্ষ জনবল গঠনের লক্ষ্যে আইকিউএসিকে ঢেলে সাজান। উপাচার্যের সরাসরি তত্ত্বাবধানে আইকিউএসির কার্যক্রম বৃদ্ধি পায় ও সামগ্রিক কর্মকান্ডে গতি আসে।  শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জন্যও আয়োজন করা হচ্ছে প্রশিক্ষণের। এসব প্রশিক্ষণে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদসহ রিসোর্স পার্সন হিসেবে উপস্থিত থাকেন বিভিন্ন পেশার বিশেষজ্ঞরা। বেশিরভাগ প্রশিক্ষণে উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষ হাতে কলমে শিক্ষা দিয়েছেন। এতে ফলপ্রসূ ও কার্যকরি হয়ে উঠেছে প্রশিক্ষণ। এসব প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং যা দৃশ্যমান হচ্ছে। শিক্ষার্থীরাও নানাভাবে উপকৃত হচ্ছেন। ফলে বিশ^বিদ্যালয়ের সর্বত্র শৃঙ্খলা ফিরে এসেছে। প্রতিষ্ঠার ১৬ বছর পর  বর্তমান প্রশাসনের শিক্ষা ও শিক্ষার্থী বান্ধব কার্যক্রমের কারণে বিশ^বিদ্যালয় শিক্ষার আদর্শ প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠছে। ফলে এক বছরেই আইকিউএসির সাফল্যে বিশ^বিদ্যালয়টি উন্নয়ন, উদ্ভাবন ও উৎকর্ষের অগ্রযাত্রায় উজ্জল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

উপাচার্য অধ্যাপক ড. এস এম আব্দুল-আওয়াল বলেন, আমি যোগদানের পর লক্ষ্য করি এখানে বিগত সময়ে দলীয়দৃষ্টি ভঙ্গির কারণে অযোগ্য ও অদক্ষ লোকবল নিয়োগ করা হয়েছে। এদেরকে যোগ্য, দক্ষ ও পেশাদার হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিভিন্ন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে আইকিউসিকে দায়িত্ব দেই। আইকিউএসির মাধ্যমে বিভিন্ন পেশার দেশি বিদেশী বিশেষজ্ঞদের নিয়ে প্রশিক্ষণের আয়োজন শুরু করি। আইকিউএসি’র বরাদ্দ বাড়ানো হয়। গত এক বছরে বিভিন্ন ধরণের ২৫টি প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করা হয়। শিক্ষার্থীদের নিয়েও প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়েছে। আমরাই প্রথম শিক্ষার্থীদের ‘যন্ত’ নেওয়া শুরু করেছি। আমাদের জনবল দক্ষ হিসেবে গড়ে উঠছে। বিশ^বিদ্যালয়ে এখন শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ বিরাজ করছে।  

আইকিউএসির পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. শামিম রেজা বলেন, আগে থেকে আইকিউএসির কার্যক্রম থাকলেও সীমাবদ্ধতার কারণে সেভাবে কাজ করতে পারছিলাম না। উপাচার্য যোগদান করেই বিশ্ববিদ্যালয়ে গুনগত শিক্ষাসহ সামগ্রিক মানোন্নয়নের জন্য নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তারই ধারাবাহিকতায় আইকিউএসি কে ঢেলে সাজানো হয়। শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি ছাড়াও, গবেষণা ও উদ্ভাবনের পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে বিভিন্ন বিষয় চিহ্নিত করে প্রশিক্ষণের বিষয় নির্ধারণ করি।  প্রশিক্ষণের ক্ষেত্র সম্প্রসারণ ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করি। বিভাগগুলোর উন্নয়নে কারিকুলাম ও স্বীকৃতি উপর জোর দেই। সবাইকে প্রশিক্ষণের আওতায় আনি। গতানুগতিকতার বাইরে এসে আমরা দেশি-বিদেশী শিক্ষক, গবেষক, বিশেষজ্ঞ ও পেশাদার ব্যক্তিদের নিয়ে কার্যকর প্রশিক্ষণ কর্মশালা পরিচালনা করছি। 

আইকিউএসি সূত্রে জানা গেছে, শিক্ষার্থীদের জন্য গত ২সেপ্টেম্বর  ও ২৫ নভেম্বর উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ কৌশল শীর্ষক প্রশিক্ষণে রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অফ এডুকেশন এন্ড রিসার্চ প্রফেসর আকতার বানু ও পাবনা মানসিক হাসপাতালের সাইক্রিয়াটিক অধ্যাপক ড. মাসুদ রানা রিসোর্স পার্সন হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। দুইদিনের এই প্রশিক্ষণে শিক্ষার্থীদের সাম্প্রতিক সময়ের নানা সমস্যা বিশেষ করে উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে  মানসিক ও একাডেমিক চাপ- যেমন পরীক্ষা ও ফলাফলের চাপ, ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার নিয়ে উদ্বেগ এবং সামাজিক প্রতিযোগিতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। এসব সমস্যা কিভাবে সমাধান করা যায় বা মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের কৌশল নিয়ে  আলোচনা ও  প্রশ্নোত্তর পর্বের কারণে শিক্ষার্থীরা ব্যাপকভাবে উপকৃত হয়েছেন বলে একাধিক শিক্ষার্থী জানান। 

গত ৩ মার্চ জাপানের ইয়ামাসানাশি বিশ^বিদ্যালয়ে সঙ্গে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ের গবেষণার সহযোগিতা সম্পর্কিত কর্মশালায় রিসোর্স পার্সন হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইয়ামানাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক হানাওয়া মাসানোরি এবং সেন্টার ফর প্রমোশন  অব ইন্টারন্যাশলাইজেশনের ডিরেক্টর অধ্যাপক হিরোমিতশু নিশজাকি। 

১৮ জুন শিক্ষার্থীদের বিদেশে উচ্চ শিক্ষা বিষয়ে দিনব্যাপী সেমিনারে রিসোর্স পার্সন ছিলেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. এস এম আব্দুল-আওয়াল। একইভাবে ২৫ জুন স্কলারশিপ ও রিসার্চ বিষয়ে উদ্বুদ্ধকরণের লক্ষ্যে ‘রোড টু হায়ার স্টাডিজ ইন অ্যাবরোর্ড’ শীর্ষক দিনব্যাপী প্রশিক্ষণে শিক্ষার্থীদের হাতে কলমে পাঠদান করেন উপাচার্য এস এম আব্দুল আওয়াল। যিনি বিশে^র অন্যতম গবেষক হিসেবে সারাবিশে^ পরিচিত। এই সেমিনার নিয়ে বাংলা বিভাগের শেষবর্ষের হোসাইন বলেন, আমরা সত্যিই অভিভূত হয়েছিলাম উপাচার্য স্যারের ক্লাস করে। কিভাবে উচ্চ শিক্ষার জন্য আবেদন করতে হয়, যোগাযোগ করতে হয়, সিভি তৈরি করতে হয়, স্কলারশিপের জন্য আবেদন করতে হয়,  মেইল করা প্রতিটি বিষয় ভিসি স্যার নিখুঁতভাবে জানান। যা এতদিন আমাদের  অজানা ছিল। স্যার দীর্ঘ সময় আমাদের হাতে কলমে শেখালেন। আমাদের চোখ তিনি খুলে দিয়েছেন। নিজেরাই বিদেশের বিশ^বিদ্যালয়ে উচ্চ শিক্ষার জন্য আবেদন করতে পারব। 

একইভাবে ২৬ জুন ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদের  শিক্ষকদের জন্য রোড টু বেইটিই এক্রিডিটেশন প্রশিক্ষণে রিসোর্স পার্সন হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মো. শামীম আহসান।

শিক্ষকদের জন্য গবেষণা প্রপোজাল শীর্ষক একটি প্রশিক্ষণ গত ২০ জানুয়ারী অনুষ্ঠিত হয়। এতে রিসোর্স পার্সন হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. নজরুল ইসলাম। ২২ এপ্রিল  সকল অনুষদের ডিন ও শিক্ষকদের জন্য ওয়ার্ল্ড ইনটেলেকচুয়াল প্রোপার্টি ডে উপলক্ষ্যে প্রশিক্ষণে রিসোর্স পার্সন হিসেবে কর্মশালা পরিচালনা করেন উপ-উপাচার্য।

গত ২০ সেপ্টেম্বর সকল ডিন ও চেয়ারম্যানদের জন্য  ইনটেলেকুচয়াল প্রোপার্টি রাইটস শীর্ষক প্রশিক্ষণে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ^বিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ড. মাছুমা হাবিব, পরিচালক দূর্গারানী সরকার। ২৯জুন শিক্ষকদের জন্য অ্যাক্রেডিটেশন সেমিনারের আয়োজন করা হয়। 

এছাড়া বিভিন্ন অনুষদের ডিন, বিভাগীয় চেয়ারম্যান দপ্তর ও শাখা প্রধানদের অফিস ব্যবস্থা, আর্থিক  ব্যবস্থাপনা নিয়ে একাধিক প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়। বিভিন্ন অনুষদ ও বিভাগ ভিত্তিক শিক্ষকদের জন্য কারিকুলাম, গবেষণা, স্বীকৃতি নিয়ে একাধিকবার প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়। তরুণ শিক্ষকদের জন্য টিচিং, লার্নিং ও অ্যাসেসমেন্ট শীর্ষক প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়।

কর্মকর্তাদের জন্য ক্যাটাগরি ভিত্তিক অফিস ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং ব্যবহারিক কম্পিউটার শীর্ষক অনেকগুলো প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়। কর্মচারীদের জন্য অফিসিয়াল রুলস, রেগুলেশান, প্রটোকল, দায়িত্ব, ফাইল ব্যবস্থাপনা, কর্মক্ষেত্রে শারিরীক নিরাপত্তা, উন্নতর সেবা শীর্ষক একাধিক প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হয়। উপাচার্য নিজেই এ সকল কর্মশালা পরিচালনা করেন। সকল ক্ষেত্রে  পেশাদারিত্ব ও সেবা নিশ্চিত করণের লক্ষ্যে নিরাপত্তা প্রহরী, আনসার সদস্য, গাড়িচালকদের জন্যও একাধিক প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়। এভাবে গত এক বছরে মোট ২৫টি প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করা হয়েছে।

আইকিউএসির অতিরিক্ত পরিচালক  মো. আসফাকুর রহমান জানান,প্রশিক্ষণের বিষয় নির্ধারণ, কীভাবে প্রশিক্ষণকে ফলপ্রসু ও কার্যকর করা যায় এ বিষয়ে উপাচার্য মহোদয় সব সময় দিক নির্দেশনা দেন। ভিসি, প্রোভিসি  ও  ট্রেজারার স্যার বেশিরভাগ প্রশিক্ষণে রিসোর্স পার্সন হিসেবে উপস্থিত থেকে নবীন বিশ^বিদ্যালয়টির তরুণ শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারীদের দিক নির্দেশনা, উৎসাহ, অনুপ্রেরণা দিচ্ছেন। আমাদের পর্যবেক্ষণ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সকলের দায়িত্ব, পেশাদারিত্ব, পেশাগত দক্ষতা অনেক বেড়েছে। 

উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. নজরুল ইসলাম বলেন, শিক্ষার্থীদের মান সম্মত শিক্ষাদান, গুনগত শিক্ষা নিশ্চিত করা ও সামগ্রিক মানোন্নয়ন প্রক্রিয়াকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত  করার জন্য শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরকে দক্ষ ও পেশাদার হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি। গুনগত শিক্ষা ও দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে আইকিউএসি কার্যকর ভূমিকা পালন করছে। ধারাবাহিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা আরও আত্মবিশ^াসী ও পেশাগতভাবে দক্ষ হচ্ছেন। আমাদের লক্ষ্য প্রশিক্ষণের মাধ্যমে টেকসই মানোন্নয়ন সংস্কৃতি গড়ে তোলা। আমরা চাই এই বিশ^বিদ্যালয় দেশের অন্যতম মানসম্পন্ন উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হোক। সে জন্য আমরা প্রশিক্ষণে শিক্ষার্থীদেরও অন্তর্ভূক্ত করেছি। শিক্ষার্থীদের জন্য আমরা আরও নতুন নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করছি। 

উপাচার্য অধ্যাপক ড.এস এম আব্দুল আওয়াল বলেন, গুনগত শিক্ষা শুধু পাঠ্যসূচি নয়, এটি একটি সংস্কৃতি। আমরা সেই সংস্কৃতি গড়ে তুলতে চাচ্ছি, যেখানে প্রত্যেক শিক্ষক, কর্মকর্তা- কর্মচারী নিজেদের দায়িত্ব নিজেরাই নিবেন। আমরা শুধু পাঠদানই করি না, আমাদের শিক্ষার্থীরা যেন সুস্থ্য, আত্মবিশ^াসী ও অনুপ্রাণিত  হয় সেটা দেখাও আমাদের দায়িত্ব।

[লেখক: মোঃ ফারুক হোসেন চৌধুরী, অতিরিক্ত পরিচালক, জনসংযোগ  ও প্রকাশনা দপ্তর, পাবনা বিজ্ঞান ও বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়।]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *