॥ ড. এম আবদুল আলীম ॥
আটচল্লিশে শুরু হওয়া ভাষা আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ পরিগ্রহ করে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে শামিল হয়ে এদিন আত্মাহুতি দিয়েছিলেন বাংলার দামাল সন্তানেরা। বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা এবং একুশের চেতনার মশাল সমুন্নত রাখার এই সংগ্রাম বায়ান্নতেই শেষ হয়ে যায়নি, পরবর্তী বছরগুলোতেও তা অব্যাহত থাকে। একুশে ফেব্রুয়ারি তথা ‘শহীদ দিবস’ পালন এবং শোষণমুক্তির সংগ্রামে যুক্ত হয়ে বহু মানুষ জুলুম-নির্যাতনের শিকার ও পুলিশের গুলিতে শহীদ হয়েছেন। এই শহীদদের একজন পাবনার সুজানগর থানা পুলিশের গুলিতে জীবন-উৎসর্গকারী কৃষক-সন্তান আবদুস সাত্তার। একুশের শহীদদের দেখানো পথে মা, মাতৃভাষা ও মাতৃভূমির মর্যাদ্দা সমুন্নত রাখার প্রত্যয়ে প্রাণ-উৎসর্গ করেন। ১৯৬৯ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি প্রভাতফেরির মিছিলে নেতৃত্বদান করতে গিয়ে তিনি শহীদ হন। বায়ান্ন একুশে ফেব্রুয়ারি ছাত্র-জনতার আত্মাহুতি দানের যে মিছিল শুরু হয়েছিল, উনসত্তুরের একুশে ফেব্রুয়ারি সেই মিছিলে শামিল হয়েছিলেন আরেক শহীদ আবদুস সাত্তার। ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত ফেব্রুয়ারি মাসে একুশের সেই বিস্মৃত ও অবহেলিত শহীদের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করতেই এ লেখার অবতারণা।
উনিশ শ উনসত্তুর। বাঙালির সংগ্রামের ইতিহাসে ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ একটি বছর। সেই বছর কবির কণ্ঠে ডাক এসেছিলÑ‘এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়।’ এই ডাকে পূর্ববাংলার জনসমুদ্রে জোয়ার এসেছিল। কৃষক-শ্রমিক, জেলে-তাঁতি, শিশু-কিশোর সকলেই সেই জোয়ারে রাজপথ নেমে এসেছিল। পূর্ববঙ্গের মানুষ এমন ইস্পাতকঠিন শপথে রাজপথে নেমে এসেছিল যে, তা শেষ পর্যন্ত রূপ নেয় ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানে। এই গণ-অভ্যুত্থানে স্বঘোষিত ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের পতন ঘটে। আগরতলা ষড়যন্ত্র মালনা থেকে মুক্ত হন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। গণ-অভ্যুত্থানের সেই ঢেউ আছড়ে পড়েছিল ঢাকার রাজপথ থেকে নিভৃত পল্লির মেঠোপথÑসর্বত্র। অন্দোলন দমনে আইয়ুব শাহীর সামরিক সরকার সর্বশক্তি নিয়োগ করে। পুলিশের গুলিতে শহীদ হন আসাদ, মতিউর-রোস্তম, শামসুজ্জোহাসহ অনেকে।
কেমন ছিল পাবনার সুজানগরের উনসত্তুরের একুশের অগ্নিগর্ভ সেই সকাল? কী ছিল তার প্রেক্ষাপট? সকালটি এমনি এমনিই অগ্নিগর্ভ হয়নি। ওই বছর ৪ জানুয়ারি সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ পেশ করে ঐতিহাসিক ১১-দফা কর্মসূচি। কর্মসূচি সফলে ঢাকাসহ পূর্ব বাংলার সর্বত্র সারা মেলে। ছাত্র-জনতা রাজপথে নেমে আসে। ১৮ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানি বাহিনীর গুলিতে শহীদ হন রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. শামসুজ্জোহা। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে জনতা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। এমন উত্তাল পরিবেশেই আসে উনসত্তুরের ২১ ফেব্রুয়ারি। অন্যান্য অঞ্চলের মতো সেদিন ভোরের আলো ফোটার আগেই পাবনার প্রত্যন্ত অঞ্চল সুজানগরের আশপাশের গ্রাম থেকে ছাত্ররা জড়ো হয় সুজানগর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে। এরপর নগ্নপায়ে মিছিল নিয়ে তারা প্রভাতফেরিতে অংশগ্রহণ করে এবং স্লোগান তোলে ‘তুমি কে আমি কে, বাঙালি বাঙালি’, ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা-মেঘনা-যমুনা’। মিছিলটি সুজানগর সদরের বিভিন্ন রাস্তা প্রদক্ষিণ করে। এতে নেতৃত্ব দেন আবদুস সোবহান, আবদুস সাত্তার, আমজাদ হোসেন, নিজাম উদ্দিন প্রমুখ। মিছিলটি সুজানগর থানার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ছাত্ররা ইংরেজিতে লেখা থানার নামফলক (‘পুলিশ স্টেশন’) ভেঙে ফেলে। এ সময় ছাত্রদের সঙ্গে পুলিশের বাক-বিত-ার এক পর্যায়ে মিছিলের অগ্রভাগ থেকে গ্রেফতার করা হয় সুজানগর সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক আবদুস সোবহান ও ছাত্রনেতা আমজাদ হোসেনকে। তাঁদের মুক্তির দাবিতে ছাত্ররা বিক্ষোভ প্রদর্শন ও থানা ঘেরাও করে। এক পর্যায়ে ছাত্রদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ শুরু হয়। পুলিশ লাঠিচার্জ করলে ছাত্ররা ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে। সংঘর্ষের এক পর্যায়ে কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই অবাঙালি পুলিশ মিছিলকারীদের ওপর গুলিবর্ষণ করে। একটি গুলি কিশোর আবদুস সাত্তারের বাঁ পাঁজোর ভেদ করে বের হয়ে যায়। তিনি মাটিয়ে লুটিয়ে পড়েন। ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়। এ সংবাদ জানাজানি হলে চারদিকে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ছাত্ররা সুজানগর থানার ওসি তোরাব আলীকে সামনে পেয়ে বেদম মারপিট করে। এক পর্যায়ে জনতার চোখ ফাঁকি দিয়ে পুলিশি পাহারায় আবদুস সাত্তারের মৃতদেহ এবং আটক ছাত্রনেতাদের পাবনায় নিয়ে যাওয়া হয়। স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও ছাত্রনেতাদের ছত্রিশ জনের নামে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দায়ের করা হয়। মামলার আসামীদের মধ্যে ছিলেন আবদুস সোবহান, আমজাদ হোসেন, আমিনুদ্দিন মাস্টার, ইব্রাহিম বিশ^াস, খোকা মৃধা, তাহের ম-ল, শের আলী খন্দকার, জামাল উদ্দিন, শুকুর আলী, সলিমুদ্দিন খান, আবদুল হাই, ইউসুফ আলী মাস্টার, নিজাম উদ্দীন, আবুল হোসেন, হোসেন আলী, আবদুল মজিদ বিশ^াস প্রমুখ।
আবদুস সাত্তারের শহীদ হওয়ার খবর মুহূর্তেই সুজানগর থেকে পাবনা জেলা শহরে পৌঁছে। এডওয়ার্ড কলেজের ছাত্রনেতারা তাৎক্ষণিকভাবে সংগঠিত হয়ে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন এবং দলে দলে সুজানগরে হাজির হন। পুলিশ লাশ সরিয়ে ফেললেও ছাত্র-জনতার প্রতিরোধে পোস্টমর্টেম শেষে ফেরত দেয়। ২১ ফেব্রুয়ারি দুপুরে সুজানগর পাইলট স্কুল প্রাঙ্গণে প্রতিবাদসভা অনুষ্ঠিত হয়। বিক্ষুব্ধ জনতার সামনে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও ছাত্রনেতারা জ¦ালাময়ী বক্তৃতা দেন। ওই সভায় উপস্থিত ছিলেন এম. মনসুর আলী, আবদুর রব বগা মিয়া, আমজাদ হোসেন, এডভোকেট আমিনুদ্দিন, ওয়াজিউদ্দিন খান, অধ্যক্ষ আব্দুল গনি, গোলাম হাস্নায়েন, অধ্যাপক আবু সাইয়িদ, মাহতাব উদ্দিন বিশ্বাস, রফিকুল ইসলাম বকুল, আব্দুস সাত্তার লালু, আমিনুল হক টিপু বিশ্বাস, নজমুল হক নান্নু, সাহাবুদ্দিন চুপপু, বেবী ইসলাম প্রমুখ। পরের দিন ২২ ফেব্রুয়ারি আবদুস সাত্তারের লাশ নিয়ে মিছিল বের করা হয়। মিছিল শেষে নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। তাঁকে দাফন করা হয় সুজানগর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় চত্বরে। কয়েক দিন পর পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ মাঠে শহীদ আবদুস সাত্তার স্মরণে শোকসভা অনুষ্ঠিত হয়। আব্দুস সাত্তারের রক্তমাখা শার্ট ছুঁয়ে ছাত্রনেতারা শপথ গ্রহণ করেন। হাজার হাজার ছাত্রের উপস্থিতিতে আয়োজিত সেই শপথ পরিচালনা করেন এডওয়ার্ড কলেজের তৎকালীন ভিপি, আতাইকান্দার পাশর্^বর্তী টাটিপাড়া গ্রামের সন্তান, ছাত্রনেতা মাহাতাব উদ্দিন বিশ্বাস। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন শহীদ আবদুস সাত্তারের পিতা আছির উদ্দিন ম-ল। আব্দুস সাত্তারের স্মৃতিকে অম্লান করে রাখতে ঐদিন সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ মিলনায়তনের নামকরণ করা হয় ‘শহীদ আব্দুস সাত্তার মিলনায়তন’। একই সঙ্গে উনসত্তরের আরেক শহীদ ড. শামসুজ্জোহার স্মরণে কলেজের মুসলিম ছাত্রাবাসের নামকরণ করা হয় ‘শহীদ শাসুজ্জোহা মুসলিম ছাত্রাবাস’। পরবর্তীকালে আবদুস সাত্তারের স্মৃতিবিজড়িত সুজানগরের আতাইকান্দা গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়টির নামকরণ করা হয় ‘শহীদ আব্দুস সাত্তার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’। এছাড়া পাবনার সাদুল্লাপুর ইউনিয়নের দুবলিয়া থেকে আতাইকান্দা পর্যন্ত সড়কের নামকরণ করা হয়েছে শহীদ আবদুস সাত্তারের নামে।
একুশের এই বিস্মৃত শহীদ শহীদ আবদুস সাত্তারের জন্ম ১৯৫৩ সালে। জন্মস্থান পাবনা সদর উপজেলার আতাইকান্দা গ্রামে। পিতা আছির উদ্দিন ম-ল, মাতা রাবেয়া খাতুন। পাঁচ ভাই, চার বোনের মধ্যে আবদুস সাত্তার জ্যেষ্ঠ। তিনি প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন কোলাদি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এরপর দুবলিয়া জুনিয়র হাইস্কুলে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করে ভর্তি হন সুজানগর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে। গভীর পরিতাপের বিষয় এই যে, আবদুস সাত্তারের শাহাদাতের সাতান্ন বছর পেরিয়ে গেলেও তিনি রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি পাননি। তাঁর পরিবারকেও দেওয়া হয়নি কোনো আর্থিক সহযোগিতা। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি না মিললেও বিস্মৃত এই শহীদের স্মৃতি বুকে ধারণ করে আছে তাঁর গ্রামবাসী, স্বজন ও সহপাঠীরা। আতাইকান্দা গ্রাম ও পাশর্^বর্তী অঞ্চলের মানুষ এখনও একুশের এই শহীদকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে। জাতির এই গর্বিত সন্তানদের যথাযথ মর্যাদায় স্বীকৃতি দিতে না পারলে এবং তাঁদের অবদান স্মরণ না করলে জাতি হিসেবে আমরা কখনোই মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবো না। কেননা, একুশের এই শহীদদের আত্মত্যাগের বিনিময়েই বাংলা ভাষা আমাদের সংবিধানে মর্যাদাপূর্ণ স্থান লাভ করেছে। শুধু তাই নয়, এসেছে আমাদের স্বাধীনতাও অর্জিত হয়েছে এই শহীদদের রক্তভেজা পথ ধরে। তাই তাঁদের অবদানের যথাযথ স্বীকৃতি দিলে তবেই অর্থবহ হবে আমাদের স্বাধীনতা।
[লেখক- ড. এম আবদুল আলীম, অধ্যাপক, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়]





