৫৫ বছর পর শহীদ মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পেলেন নূরুল ইসলাম

সংবাদদাতা : পাবনা জেলার ঈশ্বরদী উপজেলার রূপপুর গ্রামের প্রয়াত নূরুল ইসলামকে ‘শহীদ মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর গত ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে হাইকোর্ট বিভাগ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে তাঁর নামে গেজেট প্রকাশ এবং শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সনদ দেওয়ার নির্দেশ দেন।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় নূরুল ইসলাম ছিলেন ডাক বিভাগের কর্মচারী। তিনি পাবনার ঈশ্বরদী জংশনের রেলওয়ে মেল সার্ভিস (আরএমএস) অফিসে কর্মরত ছিলেন। সরকারি কর্মচারী হয়েও তিনি পাকিস্তান সরকারের আনুগত্য ত্যাগ করে তৎকালীন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের (মুজিবনগর সরকার) পক্ষে দায়িত্ব পালন করেন।

মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে পাকিস্তানি বাহিনী নিশ্চিত পরাজয়ের মুখে দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ধ্বংসে বেপরোয়া হয়ে ওঠে। সেই সময় রাষ্ট্রীয় জরুরি ডাক পরিবহনের একমাত্র ভরসা ছিল রেলওয়ে মেল সার্ভিস। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নূরুল ইসলাম দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছিলেন।

১৯৭১ সালের ৪ ডিসেম্বর সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ঈশ্বরদী জংশনের ৩ নম্বর প্ল্যাটফর্মে অবস্থিত আরএমএস অফিসে কর্মরত অবস্থায় পাকিস্তানি বিমান বাহিনীর বোমা হামলার শিকার হন তিনি। বোমা হামলায় ঘটনাস্থলেই শহীদ হন নূরুল ইসলাম। হামলায় প্ল্যাটফর্ম ও অফিসের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। তাঁর দেহ মারাত্মকভাবে ক্ষত-বিক্ষত হয় এবং দেহের নিম্নাংশ পাওয়া যায়নি। পরে পরিবারের সদস্যরা দেহের উপরের অংশ পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করেন।

শহীদ নূরুল ইসলামের বয়স ছিল ৪৪ বছর। তিনি স্ত্রী জাহানারা বেগম, দুই পুত্র ও পাঁচ কন্যা রেখে যান। তাঁর মৃত্যুর পর স্ত্রী জাহানারা বেগম বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে পেনশন গ্রহণ করেন। পেনশন বইতে উল্লেখ ছিল— “He is specially exempted by the Pakistan Government”। ২০১৭ সালে ডাক বিভাগের প্রকাশিত ‘দি পোস্টাল পিডিয়া’ গ্রন্থেও তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত হয়।
তবে দীর্ঘদিন ধরে তাঁর আত্মত্যাগের বিষয়টি রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি পায়নি। ২০১৬ সালে ডাক বিভাগ তাঁর বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করলেও তা আর আলোর মুখ দেখেনি। পরে শহীদ নূরুল ইসলামের কন্যা নূরুন নাহার বাবাকে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবিতে হাইকোর্টে রিট করেন।

প্রায় এক দশক ধরে চলা আইনি লড়াই শেষে আদালতের রায়ে স্বীকৃতি পেলেন নূরুল ইসলাম। রিটটি দায়ের করেন নূরুন নাহার এবং তাঁর পক্ষে মামলাটি পরিচালনা করেন তাঁরই পুত্র ও নূরুল ইসলামের দৌহিত্র অ্যাডভোকেট মো. মেজবাহুল ইসলাম আসিফ।
স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শহীদ মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাওয়া বাংলাদেশের ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *